৪০ হাজার টন সয়াবিন তেল মজুদদারদের ঘরে, ধারণা ভোক্তা অধিদপ্তরের

৪০ হাজার টন সয়াবিন তেল মজুদদারদের ঘরে, ধারণা ভোক্তা অধিদপ্তরের

দেশে সয়াবিন তেল থাকলেও ঈদের আগে-পরে দোকানে তা না আসায় ১০ দিনে ৪০ হাজার টনের মতো সয়াবিন তেল মজুদ হয়েছে বলে ধারণা করছে ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর।

রোববার সারাদেশে অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন দোকান-গুদাম থেকে মজুদ করা সয়াবিন তেল উদ্ধারের পর সার্বিক চিত্র সম্পর্কে এমন একটি ধারণা দেন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

তারা বলছেন, একদিকে মিল থেকে তেলের সরবরাহ ও অন্যদিকে ভোক্তারা তেলের নাগাল না পাওয়া সাপ্লাই চেইনের অন্তত ১০ দিনের তেল মজুদ হয়েছে। দৈনিক ৫ হাজার টন চাহিদা বিবেচনায় প্রায় ৪০ হাজার টন তেল মজুদ করা হতে পরে।

বিশ্ববাজারে ভোজ্য তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় গত ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে বেশ কয়েকবার মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দ্বারস্ত হয়েছিলেন ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী মিল মালিকরা। তবে নতুন করে তা বাড়াতে রাজি হয়নি সরকার।

উল্টো তেলের উপর থেকে ভ্যাট প্রত্যাহার করে দাম কিছুটা কমিয়ে আানার চেষ্টাও সরকারের পক্ষ থেকে করা হয়েছে। পাশাপাশি রোজা চলাকালীন সময়ে দাম না বাড়ালেও ঈদের পর বাজার পর্যালোচনার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

এরমধ্যে এই মাসের শুরুতে ঈদের আগে খুচরা বাজার থেকে উধাও হয়ে যায় দেশের রান্নার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সয়াবিন তেল। এরপর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সায় নিয়ে সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৪০ টাকা বাড়িয়ে ২০০ টাকার কাছাকাছি নির্ধারণ করেন মিল মালিকরা।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যেই তেল লিটার ১৬০ টাকা বিক্রি করার কথা, এখন ভোক্তাদের জিম্মি করে, বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে অসাধু ব্যবসায়ীরা সেটা ৪০ টাকা বেশি মুনাফা করবেন। এতে করে বাজার থেকে প্রায় দেড়শ কোটি টাকা মজুদদারদের পকেটে চলে যাবে বলে প্রাথমিক হিসাবে দেখা যাচ্ছে।”

তবে এটা কোনো প্রামাণ্য হিসাব নয় বলে মানলেও তিনি বলেন, “তবে এধরনের ঘটনা যে ঘটছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।”

ভোক্তা অধিকারের একজন কর্মকর্তা জানান, দেশে প্রতিদিন গড়ে চার হাজার টন থেকে পাঁচ হাজার টন সয়াবিন ও পাম তেলের চাহিদা রয়েছে এবং তা মিল পর্যায় থেকে পূরণও করা হয়। ঈদের সময় যখন বাজারে তেলের সঙ্কট তখনও মিল থেকে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা হয়েছিল। ২৮ এপ্রিল থেকে ৩০ এপ্রিল ইদের ছুটি শুরু হয়ে যাওয়ার সময়ও বিভিন্ন কোম্পানির মিল থেকে তেল সরবরাহ করার তথ্য পাওয়া গেছে।

অধিদপ্তরের মনিটরিং সেল থেকে জানান হয়, ঈদের ছুটি শুরুর পরও ২৮ ও ২৯ এপ্রিল ৭৮৮ টন সয়াবিন তেল ও ১৬৪১ টন পাম তেল সরবরাহ করেছে সিটি গ্রুপের (তীর ব্র্যান্ড) মিল। এমনকি ঈদের বন্ধের সময়ও ৩০ এপ্রিল থেকে ৪ মে এই পাঁচ দিনে ৯৪৩ টন সয়াবিন ও ৩৯২ টন পাম তেল বিপণন করা হয়েছে। একইভাবে মেঘনা গ্রুপের মিল থেকে ৭ মে তারিখে ২৫৪ টন সয়াবিন তেল সরবরাহ করা হয়েছে।

মজুদদারদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার ঘোষণা দিয়ে সফিকুজ্জামান বলেন, “আমরা খুব সহজেই এমনটি হতে দেব না। বাজার বাজারের গতিতে চলবে। পাশাপাশি কেউ যাতে পুরোনো দামের তেল নিয়ে কারসাজি করে অতি মুনাফা করতে না পারে তা ধরতে নানা ধরনের মেকানিজম করছি।”

আইন অনুযায়ী একজন ব্যবসায়ী কতটুকু তেল বা অন্যান্য পণ্য মজুদ করতে পারবেন- এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “এটা কোনো সংখ্যার হিসাব নয়। কোন পরিস্থিতিতে কার কাছে পণ্য রয়েছে। সেই পণ্য সে বিক্রি না করে ধরে রেখেছে কিনা? বিক্রি করার সময় পাকা রশিদ দিচ্ছে কিনা? এসব কিছু দেখেই আমরা অনিয়ম চিহ্নিত করব।”

রোববার ঢাকার কারওয়ান বাজার, মোহাম্মদপুরসহ বেশ কয়েকটি বাজারে অভিযান শেষে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ঢাকার জেলা কার্যালয়ের প্রধান আব্দুল জব্বার মন্ডল জানান, প্রতিটি দোকানেই নতুন দরের সয়াবিন তেলের বোতল শোভা পাচ্ছে। সয়াবিন তেলের সঙ্কট কেটে গেছে।

সকালে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে ভার্চুয়াল বৈঠকে সংস্থাটির ৬৪ জেলা ও বিভাগীয় শহরের প্রতিনিধিদের যুক্ত করা হয়। সেই বৈঠক থেকে প্রতিটি জেলায় তালিকাভূক্ত ডিলার ও পাইকারি বিক্রেতাদের কাছে থাকা মজুদ ও কয়েক দিনের বিক্রির তথ্য সংগ্রহ করতে বলা হয়।

অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সফিকুজ্জামান বলেন, “আমরা মেঘনা গ্রুপ, সিটি গ্রুপ, টিকে গ্রুপ, এস আলম গ্রুপ, বাংলাদেশ এডিবল অয়েল কোম্পানি, গ্লোব অয়েল ও বসুন্ধরা গ্রুপের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে মাঠের চিত্র মিলিয়ে দেখবো। যেখানেই তথ্যের গরমিল দেখা যাবে সেখানেই অভিযান চালানো হবে। ইতোমধ্যেই কয়েকটি অভিযানে বেশ কিছু পাইকারি বিক্রেতা ও খুচরা বিক্রেতার অসাধু ব্যবসার বিয়ষটি চিহ্নিত হয়েছি।”